for Add
মোরসালিন আহমেদ : ৩ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার, ১২:৩২:০১

এশিয়ান গেমস শেষ হয়েছে পদকহীনতায়। তবে বাংলাদেশ কাবাডির নতুন নেতৃত্বের কাছে জাপানের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের গল্পটা শুধু হার-জয়ের নয়। বরং এই আসর দেখিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক কাবাডিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখতে বাংলাদেশকে কোথায় বদল আনতে হবে, কোন জায়গাগুলোতে ঘাটতি রয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে খেলোয়াড় ও কোচ তৈরির কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
পুরুষ দলের শুরুটা অবশ্য ছিল আশাব্যঞ্জক। দক্ষিণ কোরিয়াকে ৩৯-৩৫ এবং চাইনিজ তাইপেইকে ৪৮-৪৭ ব্যবধানে হারিয়ে দারুণ সূচনা করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাগতিক জাপানের কাছে ৪০-৩৭ ব্যবধানে হেরে সেমিফাইনালে ওঠার সুযোগ হাতছাড়া হয়। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ভারতের কাছে ৪৮-২৫ ব্যবধানে হারের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুরুষ দলের অভিযান।
এদিকে নারী কাবাডিতে শ্রাবণী-বৃষ্টিরা টানা তিন ম্যাচের মধ্যে ৪২-২১ পয়েন্টে ভারতের কাছে ও ৫৪-১৯ পয়েন্টে ইরানের কাছে হারলে স্বাগতিক জাপানকে ৪৪-২২ পয়েন্টে পরাজিত করে নারী কাবাডি দল মিশন শেষ করেছে।
উল্লেখ্য পুরুষ কাবাডি দল ২০০৬ এবং নারী কাবাডি দল ২০১৪ সাল থেকে এশিয়াডে পদকই জিততে পারছে না। তাই কীভাবে আবার সেইসব পদক পুনরুদ্ধার করা যায় এ নিয়ে চলছে নানারকম পরিকল্পনা।
বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশনের (বিকেএফ) নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক মো. ইসরাইল হাওলাদারের কাছে এই এশিয়ান গেমস শুধুই ব্যর্থতার হিসাব নয়। তাঁর চোখে এটি ছিল বাংলাদেশ কাবাডির বর্তমান অবস্থান পরিমাপের একটি সুযোগ। কোথায় ঘাটতি, কেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের শেষ মুহূর্তে দল পিছিয়ে পড়ছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে সেই জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আনা যায়—এশিয়ান গেমসের অভিজ্ঞতা থেকেই সেই রূপরেখা তৈরি করতে চান তিনি।

নতুন করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা
১৯ সেপ্টেম্বর জাপানে এশিয়ান গেমস শুরু হওয়ার মাত্র নয় সপ্তাহ আগে, ১৮ জুলাই দায়িত্ব নেয় নতুন অ্যাডহক কমিটি। ওই সময় বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান মো. ইসরাইল হাওলাদার। পেশাগত জীবনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা তখন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২৩ আগস্ট তিনি পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি), গ্রেড-২ পদে পদোন্নতি পান। একদিকে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, অন্যদিকে কাবাডি ফেডারেশনের প্রশাসনিক দায়িত্ব—দুই জায়গার ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে এখন বাংলাদেশের কাবাডির কাঠামোগত উন্নয়ন। তাঁর ভাবনাটা শুধু একটি জাতীয় দলকে পরের প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করা নয়। বরং খেলোয়াড়, কোচ, ফিটনেস ও চিকিৎসা সহায়তা—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
শুধু প্রধান কোচ নয়, পজিশনভিত্তিক কোচ
বাংলাদেশের কাবাডিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রধান কোচকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা চলে আসছে। সেই জায়গায় পরিবর্তন আনতে চান কাবাডি অন্তপ্রাণ এই সংগঠক। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা প্রধান কোচের পাশাপাশি প্রতিটি ক্যাটাগরি বা পজিশনের জন্য—যেমন রেইডার ও ডিফেন্ডার—আলাদা কোচ এবং সেই সঙ্গে ফিটনেস ট্রেইনার ও ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগের পরিকল্পনা করছি। অর্থাৎ একটি দলকে শুধু এক কোচের ওপর নির্ভরশীল না রেখে রেইডিং, ডিফেন্স, শারীরিক সক্ষমতা ও চোট ব্যবস্থাপনাকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ফেডারেশন। তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে তিন মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও। এর মধ্যে দুই মাস অনলাইন প্রশিক্ষণ এবং এক মাস ভারতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। বড় কোনো টুর্নামেন্ট সামনে এলেই জাতীয় দল গঠন করে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বের হয়ে দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা তৈরির দিকে যেতে চান তিনি। কারণ কাবাডিতে ম্যাচের ফল অনেক সময় নির্ধারিত হয় কয়েকটি মুহূর্তে। একটি ভুল রেইড, একটি ভুল ট্যাকল কিংবা রক্ষণভাগের সামান্য সমন্বয়হীনতাই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের চিত্র।

এশিয়ান গেমসে যে দুর্বলতা চোখে পড়েছে
এশিয়ান গেমসের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় ঘাটতি কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তরে ইসরাইল হাওলাদার সরাসরি রক্ষণভাগের কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের দৌড় থেকে ছিটকে পড়ার পেছনে আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ভালো রক্ষণভাগের অভাব। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচটিই যেন তাঁর কথার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বাংলাদেশের শুরুটা ভালো ছিল। ম্যাচের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাগতিকদের চাপে রাখতেও পেরেছিল দল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৪০-৩৭ ব্যবধানে হেরে যায় বাংলাদেশ। সেই পরাজয়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় সেমিফাইনালের আশা। তাঁর মতে এশিয়ান গেমসের আগে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময়ও পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, আমরা যখন দায়িত্ব নিই, তখন আমাদের হাতে খুব একটা সময় ছিল না। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয়েছিল। সেই অল্প সময়েই কোচরা আমাদের রক্ষণভাগের দুর্বলতাগুলো যতটা সম্ভব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সময়ের স্বল্পতাকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না তিনি। তাঁর দৃষ্টিতে সমস্যাটা আরও গভীরে।
সংকট মানসম্মত কোচের
খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি কোচ তৈরির দিকেও নজর দিতে চান নতুন সাধারণ সম্পাদক। তাঁর মতে, মানসম্মত কোচের ঘাটতি থাকলে উন্নত খেলোয়াড় তৈরি করা কঠিন। অপর এক প্রশ্নে জানান, মানসম্মত কোচের তীব্র সংকট রয়েছে। কোচের নিজেরই যদি উন্নত জ্ঞান না থাকে, তবে তিনি কীভাবে তাঁর শিষ্যদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেবেন?” এই বাস্তবতা থেকেই ‘ট্রেনিং অব দ্য ট্রেইনার্স’ বা প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথা ভাবছে বিকেএফ। স্থানীয় কোচদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এর ফলে বিদেশি কোচের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেশে একটি শক্তিশালী কোচিং কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন কোচ নিয়োগের বিষয়টিও পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় রয়েছে।
খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইনেও নজর
শুধু জাতীয় দলের বর্তমান খেলোয়াড়দের নিয়ে পরিকল্পনা করলেই হবে না—ভবিষ্যতের খেলোয়াড় তৈরির পথটাও শক্ত করতে হবে। এ জায়গাতেও পরিবর্তন আনার কথা ভাবছে ফেডারেশন। দেশের বিভিন্ন সার্ভিসেস সংস্থার কাবাডি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইতিমধ্যে আলোচনা করেছে ফেডারেশন। পুরুষ ও নারী কাবাডি খেলোয়াড় নিয়োগের সময় শারীরিক গড়ন, বিশেষ করে উচ্চতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিপক্ষরা তাদের উচ্চতার কারণে আমাদের বিরুদ্ধে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। তাঁর প্রস্তাব, সার্ভিসেস কাবাডিতে পুরুষ খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে প্রায় ছয় ফুট এবং নারী খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতাকে একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।তবে উচ্চতা এখানে একমাত্র বিষয় নয়। মূল সমস্যা হলো পর্যাপ্ত বিকল্প খেলোয়াড়ের অভাব। জাতীয় দলের বেশ কয়েকটি পজিশনে পর্যাপ্ত ব্যাকআপ নেই। একজন খেলোয়াড় চোটে পড়লে বা ফর্ম হারালে তাঁর জায়গা পূরণ করার মতো সমমানের খেলোয়াড়ও অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। ফলে জাতীয় দলের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইন শক্ত করার বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

লক্ষ্য শুধু পরের এশিয়ান গেমস নয়
নতুন কমিটির পরিকল্পনায় তাই একটি বড় টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে সাময়িক প্রস্তুতির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরির বিষয়টিই গুরুত্ব পাচ্ছে। ভালো রক্ষণভাগ, পজিশনভিত্তিক কোচ, ফিটনেস ট্রেইনার ও ফিজিওথেরাপিস্ট, কোচদের প্রশিক্ষণ, নতুন কোচ তৈরি এবং জাতীয় দলের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প খেলোয়াড়—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন ইসরাইল হাওলাদার। আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস বাংলাদেশ কাবাডিকে কোনো পদক এনে দিতে পারেনি। কিন্তু সেই পদকহীন অভিযানই যদি দেশের কাবাডির দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের পথ দেখায়, তাহলে জাপানের সেই অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে পরিবর্তনের সূচনা। এখন দেখার বিষয়, পরিকল্পনাগুলো কতটা দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় এবং বাংলাদেশের কাবাডি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবারও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে কি না।
For add
For add
For add
For add
for Add